নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী কারামুক্ত হতে পারেন বলে আশা করছেন তার আইনজীবীরা। রবিবার (১৭ মে) আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত সিদ্ধিরগঞ্জ থানার সর্বশেষ দুটি মামলাতেও তার হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রেখেছেন। এর ফলে তার বিরুদ্ধে থাকা মোট ১২টি মামলার সবকটিতেই জামিন মঞ্জুর হয়েছে এবং তার কারামুক্তিতে আর কোনও আইনি বাধা নেই। আদালতের আনুষ্ঠানিক জামিন আদেশ ও এর অনুলিপি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন।
তবে সোমবার (১৮ মে) বেলা পৌনে ১২টা পর্যন্ত তার জামিনের কাগজপত্র জেল গেটে যায়নি। কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেলার রিজিয়া বেগম বলেন, বেলা পৌনে ১২টা পর্যন্ত আইভীর জামিনের কাগজপত্র আমরা হাতে পাইনি।
এর আগে রবিবার হত্যার অভিযোগে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুই মামলায় আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রাখা হয়।
হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে ‘নো অর্ডার’ দিয়েছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক এ আদেশ দেন।
ফলে ওই দুই মামলাসহ মোট ১২ মামলায় আইভীর জামিন বহাল রয়েছে এবং তার কারামুক্তিতে এখন আইনি কোনও বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা।
এর আগে ১০ মামলায় হাইকোর্টে জামিন মঞ্জুরের পর সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওই দুটি মামলায় আইভীকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এর মধ্যে ২ মার্চ একটি মামলায় এবং ১২ এপ্রিল অপর মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুই মামলায় ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট রুল দিয়ে আইভীকে অন্তর্র্বতীকালীন জামিন দেন। এই জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক আবেদন করে। আবেদন দুটি চেম্বার আদালতের রবিবারের কার্যতালিকায় ৪১ ও ৪২ ক্রমিকে ওঠে।
আদালতে আইভীর পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু ও আইনজীবী এস এম সিদ্দিকুর রহমান শুনানি করেন। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী এস এম হৃদয় রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দা সাজিয়া শারমিন।
১০ মামলায় জামিন বহাল
গত বছরের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের নিজ বাসা থেকে আইভীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তাকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় হওয়া তিনটি হত্যা মামলা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
এই পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট গত বছরের ৯ নভেম্বর আইভীর জামিন মঞ্জুর করে রায় দেন। এ জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে পৃথক পাঁচটি আবেদন করে। চেম্বার আদালত গত বছরের ১২ নভেম্বর হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনগুলো আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান।
এর ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক পাঁচটি লিভ টু আপিল করে। লিভ টু আপিলগুলো খারিজ করে ১০ মে আদেশ দেন আপিল বিভাগ। ফলে পাঁচ মামলায় আইভীর জামিন বহাল থাকে।
তবে প্রথম দফার ওই পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট জামিন দেওয়ার পর আইভীকে আরও পাঁচ মামলায় গত বছরের নভেম্বরে গ্রেফতার দেখানো হয়। এই পাঁচ মামলার মধ্যে চারটি ফতুল্লা থানায় করা হত্যা মামলা। অপরটি হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় করা মামলা।
দ্বিতীয় দফার পাঁচ মামলায় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট জামিন প্রশ্নে রুল দিয়ে আইভীকে ছয় মাসের অন্তর্র্বতীকালীন জামিন দেন। এই জামিন আদেশের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। গত ৫ মার্চ চেম্বার আদালত শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনগুলো আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠান।
দ্বিতীয় দফার এই পাঁচ মামলায় আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা পৃথক লিভ টু আপিল ১০ মে আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ওঠে। সেদিন আপিল বিভাগ আইভীর জামিনে ইতিপূর্বে চেম্বার আদালতের দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে হাইকোর্টে রুল (জামিন প্রশ্নে) নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের পৃথক পাঁচটি লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে এ আদেশ দেওয়া হয়। ফলে দ্বিতীয় দফার পাঁচ মামলায় আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল হয়।
আইভীর অন্যতম আইনজীবী এস এম হৃদয় রহমান বলেন, ‘১২ মামলায় আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিনাদেশ ও জামিন বহাল রেখে আপিল বিভাগের দেওয়া আদেশে কারা কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এই প্রক্রিয়া শেষে তিনি মুক্তি পেতে পারেন।’
আইভীর মুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ কারাগারের জেলা সুপার মোহাম্মদ ফোরকান ওয়াহিদ বলেন, আইভী এখনো কাশিমপুরে মহিলা কারাগারে রয়েছেন। এখনো নারায়ণগঞ্জ কারাগারে আসার কোন নির্দেশনা আমি পাইনি। পেলে আপনাদের অবশ্যই জানানো হবে।
জানা গেছে, ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়লাভ করে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নারী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আইভী। পরে ২০১১ সালে নারয়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি মেয়র হিসেবে জয়লাভ করেন। ওই নির্বাচনে প্রভাবশালী শামীম ওসমানকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে তিনি দুর্দান্ত দাপটে ছিলেন।
পরে ২০১৬ সালে দ্বিতীয় ও ২০২২ সালে তৃতীয় দফায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় নৌকা প্রতিক নিয়ে লড়াই করে জয়লাভ করেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এছাড়া তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাও পেয়েছিলেন। ফলে টানা তিন মেয়াদে সিটি করপোরেশনের মেয়র ও এক মেয়াদে পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে আসিন থেকে দুর্দান্ত ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন তিনি। তার এক কথায় সিটি করপেরেশনের বড় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। এমনকি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুডবুকে থাকার ফলে দুর্দান্ত দাপটের সাথে ক্ষমতার সংমিশ্রণে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হন আইভী।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ওই বছরের ১৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন সহ দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে মেয়র পদ থেকে অপসারণ করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইভীর জনপ্রিয়তার ্ঈর্ষানিত হয়ে একটি পক্ষ তার মুক্তিতে নানাভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করে ওই পক্ষটি কাজ করছে। তাছাড়া আইভী মুক্তি পেলে ফের নাসিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে জয়ের প্রবল সম্ভবনা রয়েছে। সেকারণে দুটি পক্ষ তার বিরোধীতা করে আসছে।