নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মদনপুর- এক সময় ছিল শান্ত জনপদ। কিন্তু গত তিন দশকে এলাকা পরিণত হয়েছে সন্ত্রাস-প্রভাবিত ‘খুনের জনপদে’। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, জমি দখল ও প্রভাব বিস্তারের লড়াইকে কেন্দ্র করে এই এলাকায় খুন হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। এর মধ্যে একই পরিবারের সাত সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে ধারাবাহিকভাবে। সর্বশেষ নিহত হন মনিরুজ্জামান মনু। পরিবারের অভিযোগ, প্রভাবশালী আসামিদের ছত্রছায়ায় একের পর এক হত্যাকাÐ ঘটলেও বিচার হয়নি অধিকাংশেরই।
স্ত্রী-সন্তানের সামনে নৃশংস হত্যা
২০২৪ সালের ৭ জুন নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে মনিরুজ্জামান মনু (৩৮)–কে। যে উঠানে তাকে খুন করা হয়, সেটিই তার পৈতৃক ভিটা। এ ঘটনার একটি ভীতিকর পরিস্থিতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পেলেও আজও বিচার মেলেনি।
নিহতের স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, বিয়ের পর থেকেই নরসিংদিতে থাকতাম। স্বামীর প্রাণনাশের ভয় ছিল সবসময়। যা ভাবছিলাম তাই হলো। জানাজা উপলক্ষে ৬ জুন মনু নারায়ণগঞ্জে আসেন। রাতে তিনি নিরাপত্তার জন্য বন্ধুর বাড়িতে থাকলেও পরদিন স্ত্রী-সন্তানদের আনতে নিজের বাড়িতে যান। অভিযোগ, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নয়ন প‚র্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী মনুর অবস্থান শত্রুপক্ষকে জানিয়ে দেন। অর্থের লোভে মনু হত্যায় সহযোগিতার জন্য নয়ন নেন ১০ লক্ষ টাকার প্রতিশ্রুতি—এমনটাই অভিযোগ চার্জশিটে।
স্ত্রী-সন্তানের সামনে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় মনুকে। পরিবারের সদস্যরা বাধা দিলে তাদের ওপরও চলে নির্যাতন।
এক পরিবারের আরও সাতজন নিহত
জানা গেছে, মনু ছিলেন পরিবারের শেষ পুরুষ সদস্য। এর আগেই খুন করা হয়েছে তার মা ফুলমতি বেগম, বাবা কামাল উদ্দিন, দুই ভাই—ন‚রা ও বাবুল (২০০৩ সালে প্রকাশ্যে গুলি ও কোপানো), দুই বোন—নিলুফা ও রেহেনা (একজনের মরদেহ মিলেছে, অন্যজন নিখোঁজ দীর্ঘদিন)।
মনু পরিবারসহ এলাকা ছেড়ে গাজীপুর-নরসিংদিতে আত্মগোপনে ছিলেন। তবুও রক্ষা পাননি।
ভিডিওর বুদ্ধিমত্তায় মামলায় গতি
মনু হত্যাকাÐের সময় দুই শিশু ভিডিও ধারণ করে। একজনের মোবাইল ছিনিয়ে নিলেও অন্য শিশু উপস্থিত বুদ্ধিতে মোবাইল লুকিয়ে রাখে ফ্রিজের ভেতর। সেই ভিডিও পান তদন্তকারীরা, যা পুরো মামলার গতিপথ বদলে দেয়।
চার্জশিটে হত্যার প‚র্ণ বিবরণ
পুলিশ চার্জশিটে জানিয়েছে—সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল ভিডিওতে দেখা যায়, আসামি টিটু, জনি, মোজ্জামেল, ফরহাদ, রাসেলদের ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে। আসামি রাহাত, নাঈম, কাউসার, ইউনুছ দৌড়ে ঘটনাস্থলের দিকে যেতে দেখা যায়। ঘটনার সময় মিঠুর পরনে ছিল নীল লুঙ্গি ও কফি-ক্রিম রঙের টি-শার্ট, টিটুর ছিল ক্রিম রঙের টি-শার্ট ও কালো-ব্রাউন শর্টস।১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে কয়েকজন আসামি হত্যায় অংশগ্রহণের কথা স্বীকার করেছে। চার্জশিটে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—গেট ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে মনুকে মারধর করা হয়, পরে বাইরে এনে পিটিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
আধিপত্যের লড়াই: কীভাবে গড়ে উঠল ‘খুনের জনপদ’
চার্জশিট ও এলাকাবাসীর বর্ণনা অনুযায়ী- ১৯৯০-এর দশকে সুরত আলী বাহিনীর উত্থানে উত্তরের বন্দর পরিণত হয় ‘সন্ত্রাসের জনপদে’। সুরত আলীর মৃত্যুর পর নেতৃত্ব নেন কাবিলা ও মকবুল।
২০০৫ সালে মকবুল ক্রসফায়ারে নিহত হলে পরিস্থিতি বদলায়। অন্যদিকে কামরুজ্জামান কামু বাহিনীও আধিপত্য স্থাপন করে।
দুই বাহিনীর লড়াইয়ে হাইওয়ে চাঁদাবাজি, জমি দখল, পরিবহন ব্যবসা, কলকারখানার ঝুট নিয়ন্ত্রণ গড়ে ওঠে দু’পক্ষের দখলে। এলাকায় তখন এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় যে-ভাড়াটিয়া থাকতে চাইতো না, কেউ আত্মীয়তা করতেও ভয় পেত”-বলছেন স্থানীয়রা।
মনু ছিলেন এই আধিপত্যের বড় বাধা বলে দাবি পরিবারের। আসামিদের পাল্টা দাবি মনু হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি মনির বলেন, ‘হত্যার সময় আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। মনুরাই কামুদের বাহিনির সদস্য ছিল।
আরেক আসামি মন্টিু দাবি করেন, পুলিশ ও মনুর পরিবারকে টাকা না দেওয়ায় তাকে আসামি করা হয়েছে।
আসামি টিটু দাবি করেন, “ডাকাতির সময় গণপিটুনিতে মারা গেছে মনু। তবে পুলিশের চার্জশিট, ভিডিও প্রমাণ ও জবানবন্দি এসব বক্তব্যকে সমর্থন করে না।
তবে অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন,দীর্ঘদিন বিচার না হওয়া ও রাজনৈতিক ছত্রছায়াই মুরাদপুরের মতো জনপদগুলোকে রক্তাক্ত করে তুলেছে।
মনুর স্ত্রী সাবিনা এখনো সন্তানদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি বলেন, বিচার চাইতে গেলেই হয়রানি। ঘরবাড়ি বিক্রি করতে চাই, কিন্তু আসামিরা বাধা দেয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক পরিবারের সাতজন হত্যার ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে নিঃস্বই করেনি-প্রকাশ করেছে দেশের রাজনৈতিক-অপরাধী নেটওয়ার্ক, বিচারহীনতা ও প্রভাবশালীদের দাপটের নির্মম বাস্তবতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনির পাশাপাশি সমাজের সচেতন মহল ও রাজনৈতিক শুভবুদ্ধির সমন্বয় ছাড়া এই ভয়ংকর সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা কঠিন।