*হাত বাড়ালে মেলে মাদক
*মাদক ব্যবসায়ীদের সন্ত্রাসী বাহিনীতে তটস্থ
*সিন্ডিকেটের রাঘব বোয়ালরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় চলছে রমরমা মাদক ব্যবসা। হাত বাড়ালেই দেদারছে পাওয়া যাচ্ছে মাদক দ্রব্য। নানান ধরনের সিগ্ন্যাল ও কৌশল ব্যবহার করে চলছে এসব মাদক ব্যবসা। বিশেষ করে রাতের আধাঁরে সবচেয়ে বেশি মাদকের বেচা-কেনা হয়। মাদকের পাইকারী ও খুচরা বিক্রেতারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদকের কারবার করে আসছে। এ নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে মাদক ব্যবসায়ীদের পালিত সন্ত্রাসী বাহিনীর রোশানলের শিকার হতে হয়। তাছাড়া অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে মাদক ব্যবসায়ীরা গ্রেফতার হলেও বিশাল সিন্ডিকেটের সুবাদে কিছুদিনের মধ্যে জামিনে মুক্তি পেয়ে যান। ফলে এ নিয়ে সাধারণ জনগণ মুখ খুলতে ভয় পায়। যেকারণে এসব মাদক বিক্রেতারা ক্রমশ বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদক মামলায় কোন ব্যবসায়ী গ্রেফতার হয়ে আদালতে গেলেও কিছুদিনের মধ্যে জামিনে বের হয়ে আসেন। মূলত মাদক ব্যবসায়ীদের রয়েছে বিশাল সিন্ডিকেট। আর সেই সিন্ডিকেটের বড় বড় রথি মহারথিদের নির্দেশে নানা মহলকে ম্যানেজ করে বার বার ছাড় পেয়ে যায় এসব ব্যবসায়ীরা। ফলে ড্যামকেয়ার মুডে মাদকের কারবার চালিয়ে যায় এসব ব্যবসায়ীরা।
ফতুল্লার মুসলিমনগর এলাকায় নানা কৌশলে ও প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে মাদক দ্রব্য। বেশ কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা সমন্বয় করে পাইকারী ও খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করছে মাদক দ্রব্য। ফতুল্লা মুসলিমনগর এলাকার বাদল (৫৫) ও আউয়াল (৫৫)। তারা দুজন মেঘনা তেল পাম্প থেকে তেল এনে বক্তবলী ফেরী ঘাটে বিক্রি করে। এই তেল বিক্রির আড়ালে তারা মাদকের পাইকারী ব্যবসায়ী। এছাড়া মুসলিম নগর এলাকার মোক্তার (৫০) ও মুকুল (৩৬) তাদের পরিবারের প্রায় সবাই মাদক বিক্রির সাথে জড়িত। এরা শাহীল গ্রুপের দক্ষিণ পাশে কাইল্লা রখমতের বিল্ডিং গলি এলাকায় রমরমা মাদক বিক্রি করে আসছে। তারা সকলে পাইকারী ডিলার হিসেবে মাদক ব্যবসা করে আসছেন।
খুচরা মাদক বিক্রেতা হিসেবে রয়েছে ওই এলাকার সানী, তার ভাই তানভীর, আক্তার, দিদার (৪৭), শাহাদাত (৩১), নাঈম (৩২)।
আউয়াল, তার ভাই মোক্তার হলেন মাদকের পাইকারী ডিলার। আর তাদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতা হিসেবে কাজ করেন তার দুই ভাই আক্তার ও দিদার।
অন্যদিকে মোক্তারের তিন ছেলে খুচরা মাদক বিক্রেতা হিসেবে ব্যবসা করে আসছেন। তারা হলেন- সানি, তানভীর ও শাহাদাত। এরা সকলে ডিলারদের কাছ থেকে মাদক সংগ্রহ করে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করে আসছেন।
এদিকে ফতুল্লার রেলস্টেশন, ব্যাংক কলোনী, পিলকুনী, বায়েজিদ বোস্তামি রোড, জোড়পুল, সাহারা সিটি মাঠ, চেয়ারম্যান বাড়ী গলি, প্লাটফর্মের পশ্চিমে খোলার সহ আশপাশ এলাকায় মাদক দ্রব্য হয়ে উঠেছে অতিমাত্রায় সহজলভ্য।
স্থানীয়রা জানায় প্রশাসনের নির্লিপ্ততার সুযোগ কে কাজে লাগিয়ে এ সকল এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা কোন কিছুর তোয়াক্কা না করেই নির্বিঘেœ চালিয়ে যাচ্ছে মাদক ব্যবসা।
স্থানীয় এলাকাবাসীর সাথে আলাপকালে জানা যায়, ফতুল্লার প্লাটফর্ম এর ব্রীজের নিচে দীর্ঘদিন ধরে শাহিন ওরফে মুরিদ শাহিন, আলআমিন, জাবেদ তাদের ৫-৬ সহোযোগির মাধ্যমে প্রকাশ্যে হেরোইন, গাঁজা, ফেন্সিডিল ও ইয়াবা বিক্রি করাচ্ছে।
জানা যায়, স্থানীয় বিএনপি নেতার শেল্টারে শাহিন, আলামিন, শান্ত প্লাটফর্ম সংলগ্ন মসজিদ এবং চেয়ারম্যান বাড়ী গলি এলকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করছে।
দাপা মসজিদ এলাকায় মাদক বিক্রি করছে রিপন কাজী, মেয়ে সোনয়া কাজী, শর্মী, সাহার সিটি মাঠ ও রেলস্টেশন পুরান বাজার এলাকা সহ আশপাশের অলিগলিতে টুটুল, টিউমার রুবেল, দাপা কাবরস্থান সড়ক এলাকায় টিকি মরা লিটন, পাইলট স্কুল এলাকায় ওস্তাগার ফারুক, দাপা ব্যাংক কলোনী এলাকায় শাওন, হান্ড্রেড বাবু, পিচ্চি সোহেল, রেল স্টেশন মান্নান সুপার মার্কেটের পেছনে রয়েছে বহুল আলোচিত বোবা বাড়ীর গাজার স্পট,বায়েজীদ বোস্তামী রোড (ব্যাংক কলোনী এলাকায়) শাকিল,আল আমিন, হানিফ, রাজিব, পুরান ক্যালিক্স স্কুল গলিতে মেহেন্দি মিলন, পিচ্চু,শারজাহান রি রোলিং মিলস খাঁ বাড়ী এলাকায় শাহাজুল, মেহেদী, নাসরিন, খা বাড়ীর রাসেল, রেল স্টেশন সিগন্যাল পুলে আল আমিন, রুবেল, শাকিল, শুভ, পাইলট স্কুলের পূর্বে রেল লাইনের পাশে রুবেল দুটি রুম ভাড়া নিয়ে জাল টাকার ব্যবসা সহ ইয়াবা ও গাঁজার গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করে আসছে বলে জানা যায়। তাছাড়া কায়েমুননেছা কলেজ সংলগ্ন রয়েছে হজরতের গাজার স্পট। যেখানে প্রকাশ্যে বিক্রি হয়ে থাকে।
নির্ভরযোগ্য একাধিক তথ্য মতে, এ সকল অধিকাংশ মাদক স্পটের মাদক কারবারীদের কে পাইকার ভাবে মাদক সরবরাহ করে থাকে ফতুল্লার শির্ষ স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী মহসিন ওরফে মাইচ্ছা মহসীন।
অন্যদিকে ফতুল্লার আলীগঞ্জে হাত বাড়ালেই মিলছে গাজাঁ, হেরোইন, ইয়াবা ট্যাবলেট, ফেনসিডিলসহ সকল প্রকার মাদক। আলীগঞ্জের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে আলিগঞ্জের প্রতিটি অলি-গলি ছেয়ে গেছে মাদকে। এতে করে মাদকের নিরাপদ ও সুরক্ষিত গোডাউন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে আলীগঞ্জ।
স্থানীয়দের তথ্য মতে, প্রভাবশালী একটি মহলের ছত্রছায়ার পাশাপাশি একাধিক পুলিশ সোর্সেদের যোগসাজশে জুয়েল ওরফে ক্যাপ জুয়েল ও পুলিশের কথিত সোর্স রাসেল ওরফে সল্টু রাসেল ও সোর্স শান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে আলীগঞ্জের সিংহভাগ মাদক বাজার। আর মাদক বাজারে এই তিন প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীর রয়েছে প্রায় দুই ডজনেরও বেশী সেলসম্যান বা খুচরা বিক্রেতা। এছাড়াও বিচ্ছিন্ন ভাবে রয়েছে প্রায় শতাধিক খুচরা মাদক বিক্রেতা। প্রতিটি মাদক স্পট থেকে মাসোয়ারা নিয়ে তাদেরকে সর্ব প্রকার সহযোগিতা করে আসছে স্থানীয় প্রশাসনের সোর্স ও মাদকের পাইকার বলে খ্যাত মহসিন ওরফে মাইচ্ছা মহসিন।
তথ্য মতে, সল্টু রাসেল ও তার স্ত্রী কবিতা বর্তমানে কৌশল পাল্টে মাদক ব্যবসা করে আসছে। মাদকের টাকায় বাড়ি কিনে ইতোমধ্যে সফল মাদক ব্যাবসায়ী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে সে। সেই সাথে মাদক বিক্রির স্থানও পরিবর্তন করেছে। বর্তমানে সল্টু রাসেলের প্রধান সেলসম্যান হিসেবে রয়েছে রাজিব। আর এই রাজিবের নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে প্রায় দেড় ডজনেরও বেশী সেলসম্যান। আইন-শৃংখলা বাহিনী এবং এলাকাবাসীর কঠোরতার মুখে আলীগঞ্জ ছাড়তে হয়েছিল সল্টু রাসেলকে। পরে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে আবারো এলাকায় প্রবেশ করে অতিতের মতো নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে মাদক ব্যবসা।
অপরদিকে জুয়েল ওরফে ক্যাপ জুয়েলও প্রকাশ্যে নির্বিঘ্নে বেচাকেনা করছে মাদক। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জুয়েলের হয়ে প্রায় ডজন খানেক সেলসম্যান মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মসজিদ গলি থেকে রেল লাইন পর্যন্ত বিভিন্ন অলিগলিতে অবস্থান করে বিক্রি করছে নানা ধরনের মাদক।
সূত্র মতে, ক্যাপ জুয়েলের মাদক ব্যবসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে তার বউ ও শ্বশুর। এছাড়া আলীগঞ্জের মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ডেনী, সোর্স আয়নাল ওরফে আইনু, সোর্স বগি সাইদ, খুকি মেম্বারের ভাই কবির, রাশু ওরফে রাসেল, মস্তাকিন। এদের নিয়ন্ত্রণে আলীগঞ্জের বিভিন্ন গলিতে মাদক বিক্রেতারা হচ্ছে রেললাইনের পূর্ব পাশে গাঁজা ব্যবসায়ী খোকা, মেহারীর ছেলে সোহেল, রেললাইন মসজিদের সাথে আফসার ড্রাইভার, আলীগঞ্জ পূর্বপাড়ার বক্কর মেম্বার এর ভাই শেক্কুয়া, আলীগঞ্জ রেললাইনের পূর্ব পাশে মাদ্রাসা রোডে পোকনের ছেলে জসিম, আলীগঞ্জ রেললাইন মসজিদের পাশে আফসার ড্রইভারের ছেলে ইকবাল ড্রাইভার, আলীগঞ্জ তিন রাস্তার মোড় এলাকার ওয়াসিম, একই এলাকার বারেক এর ছেলে ড্রইভার জুয়েল ও তার ছোট ভাই আহাম্মদ এবং কালা বিল্লাল, ইজ্জৎ মহাজন এর বাড়ীর গল্লিতে সাবু মিয়ার ছেলে চোর শাহীন, একই এলাকার ইসহাক মিস্ত্রীর ছেলে কেপ রুহুল তার ছোট ভাই সজীব এবং বড় জাহানের ছেলে আক্তার, অলী হাজ্বীর ছেলে হাফিজ, আলীগঞ্জ মসজিদ রোডের সালাম ড্রাইভারের ছেলে রাশু, আলীগঞ্জ পাচঁতলার মোড়ে মোল্লার ছেলে মোস্তাকিম, আব্দুল মজিদের ছেলে সল্টু রাসেল, পাচঁতলার আলীগঞ্জ মোল্লা বাড়ীর মৃত আলমাছ মরল এর ছেলে চোল্লা মাসুম, কাজীপাড়ার নাজমুল, মোক্তার, আলীগঞ্জ জং বাড়ী মধ্যপাড়ার মৃত আবুল এর ছেলে লম্বা জুয়েল, জং বাড়ী মধ্যপাড়ার রাজীব,জং বাড়ীর টেবলেট সুমন, আলীগঞ্জ তিন রাস্তার মোড়ের হাইদু, ইসহাক মিস্ত্রীর ছেলে সজীব, আহাম্মদ, আরমান, আলীগঞ্জ মেইন রোডের বিপ্লব, মোফাজ্জল কাজীর ছেলে টার্নিং জুয়েল,আলীগঞ্জ অটো গ্যারেজের ইসলার ছেলে মোটু রুবেল, আলীগঞ্জ স’মিল রোড বাসেদ এর বাড়ীর ভাড়াটিয়া মৃত আব্দুর সাত্তার মিয়ার ছেলে বাবু ড্রাইভার, ‘স’মিল এর পাশে জরিনার ছেলে সুন্দর রনি, ইজ্জৎ মহাজন এর বাড়ীর গল্লিতে পোটলা রুবেল, বাইট্টা ইমরান, আলীগঞ্জ পাচঁ তলার মোড়ে লেহার নাতি ইমরান, ইলিয়াসের ছেলে আওলাদ, আলীগঞ্জ নতুন বাজারের নাইম সহ আরো অনেকেই নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা করে আসছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং সোর্সরা এই সকল মাদক ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে অবৈধ সুবিধা নিয়ে তাদেরকে নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা করার সুযোগ করে দিচ্ছে। মাদকের সুরক্ষিত গোডাউন বলে পরিচিত আলীগঞ্জ এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে জেলা পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে তারা।