নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ৬ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিজানকে ঘিরে একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকা-, চাঁদাবাজি এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে এলাকায় চরম উদ্বেগ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী গড়ে তুলে তিনি এলাকায় এক ধরনের আধিপত্য বিস্তার করেছেন, যার কারণে সাধারণ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মিজান গং নামে পরিচিত একটি চক্র ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে গাবতলী ও টাগাড়পাড় এলাকায় নিয়মিত চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক এবং ছোট দোকানদারদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে হুমকি, ভয়ভীতি এমনকি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রতিদিনই কোনো না কোনো অজুহাতে টাকা চাওয়া হয়। দোকান চালাতে গেলেও শান্তিতে থাকা যায় না। কেউ প্রতিবাদ করলে তার ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। তারা আরও বলেন, এই পরিস্থিতিতে অনেকেই বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার কথাও ভাবছেন।
এই চক্রের অন্যতম সক্রিয় সদস্য হিসেবে মুকুল নামে এক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে বিএনপির একটি পদে থেকে মিজানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। স্থানীয়দের দাবি, মুকুল নিয়মিতভাবে বিভিন্ন এলাকা থেকে চাঁদার টাকা সংগ্রহ করে মিজানের কাছে পৌঁছে দেন। শুধু মুকুলই নন, মিজান গংয়ের প্রতিটি সদস্যই এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া, অভিযোগ উঠেছে যে এই চক্রটি সংগৃহীত অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। মিজান নিজে একটি বড় অংশ রেখে বাকি অর্থ গ্যাংয়ের সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করেন বলে জানা গেছে। এতে করে পুরো গোষ্ঠীটি একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক চক্রে পরিণত হয়েছে, যা ভাঙা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, মিজান গং নিয়মিতভাবে প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যকে মাসিক ভিত্তিতে মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদান করে থাকে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
এ বিষয়ে এক ভুক্তভোগী বলেন, আমরা থানায় যেতে ভয় পাই। কারণ তারা আগে থেকেই সব ম্যানেজ করে রাখে। অভিযোগ দিলেও কোনো লাভ হয় না।
এই অভিযোগগুলো সত্য হলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। সচেতন মহলের মতে, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন ও বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যাবে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই ব্যক্তি নাকি এই গংয়ের সন্ত্রাসী কর্মকা-ে নীরব সমর্থন দেন এবং বিনিময়ে নিয়মিত অর্থ গ্রহণ করেন। এমনকি তার আড়ালে একটি পৃথক চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে বলেও দাবি উঠেছে।
এ ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের দাবি, এই চক্রের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের গ্রেফতার করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল হিসেবেও বিএনপির প্রতি দাবি উঠেছে, তারা যেন অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কারণ, কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকা- চালানো হলে তা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে।
স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অপরাধ সংগঠিত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তবে প্রযুক্তির এই যুগে তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে এসব ঘটনা এখন বেশি আলোচনায় আসছে। ফলে প্রশাসনের জন্যও দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান জানান, আমরা এখন এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পায়নি পেলে অবশ্যই কোঠর ব্যবস্থা নিবো।
ফতুল্লার এই ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি এলাকার সমস্যা নয়, বরং এটি বৃহত্তরভাবে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনীতি এবং সমাজ ব্যবস্থার একটি প্রতিচ্ছবি। অভিযোগগুলো যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা আইনের শাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এখন সময় এসেছে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়ার যাতে সাধারণ মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়।
অভিযুক্ত মিজানুর রহমান মিজান বলেন, অনেকে অনেক কথা বলে। তবে আপনারা তদন্ত করে দেখেন- আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের কোন অভিযোগ পান কিনা।