নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রধান সড়ক বিবি রোডে হকার সহ অবৈধ দখলদারিত্ব উচ্ছেদ করতে ১৩ এপ্রিল থেকে অ্যাকশন শুরু হবে। নগরবাসী দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অন্যতম কারণ হিসেবে ফুটপাতের হকারকে দায়ী করে আসছিল। এছাড়া সড়কে অবৈধ দখলদারিত্ব ও অবৈধ পার্কিয়ের কারণে শহরে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ফলে সব মিলিয়ে নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নগরবাসীর নির্বিঘেœ চলাচলের জন্য এবার সিটি করপোরেশন ও প্রশাসন নড়ে চড়ে বসেছে। তবে অতিতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে নগরবাসী বলছেন, এই শহরের ফুটপাত দখল মুক্ত করতে গিয়ে ২০১৮ সালের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। তবুও হকার উচ্ছেদ হয়নি। পরবর্তীতে প্রশাসনের আইওয়াশ অভিযান হকারদের বারংবার কৌশলে ফুটপাতে ফিরে আসতে সুযোগ করে দিয়েছে।
১৩ এপ্রিল হকার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়ে রবিবার (১২ এপ্রিল) জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে প্রশাসন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগামী ১৩ এপ্রিল (সোমবার) সংসদ সদস্য আবুল কালাম ও সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করবে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।
অভিযানে সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, র্যাব-১১, আনসার, বিএনসিসি, স্কাউটসসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেবেন।
এদিকে ১৩ এপ্রিল থেকে বিবি রোডে হকার না বসা এবং অননুমোদিত পার্কিং না করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উচ্ছেদ অভিযানে সর্বস্তরের নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করেছে প্রশাসন।
এর আগে গত ৮ এপ্রিল দুপুরে নাসিক ভবনে নগরীর বিভিন্ন ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান হকার উচ্ছেদের ঘোষণা দেন। এ সময় তিনি বলেন, শহরের যানজট ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই অভিযান চালানো হবে। চাষাড়া শহীদ মিনার এলাকা থেকে শুরু হয়ে অভিযান ধারাবাহিকভাবে চলবে।
নাসিক প্রশাসক জানান, অতীতে সমন্বয়ের অভাবে সমস্যাগুলো স্থায়ীভাবে সমাধান হয়নি। এবার সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
হকারদের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রকৃত হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বিশেষ করে বিবি রোড হকারমুক্ত রাখা হবে।
এখানে উল্লেখ্য যে, ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি এ সড়ক থেকে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে তৎকালীন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। হামলায় নেতৃত্ব দেন সেইসময়কার আওয়ামী লীগের এমপি শামীম ওসমান। ওইদিন আইভী ছাড়াও সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনের নেতাসহ অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। এরপর স্থায়ীভাবে হকারমুক্ত করা সম্ভব হয়নি বঙ্গবন্ধু সড়ক।
এদিকে, শহরের প্রায় সব সড়কেই হকার বসানোকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা-কর্মী এবং সিটি কর্পোরেশনের অসাধু কর্মচারীরা এর সঙ্গে জড়িত।
সূত্র বলছে, বঙ্গবন্ধু সড়কের বিভিন্ন অংশে ভোর পাঁচটা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অন্তত হাজার খানেক স্পট ভাড়া দিয়ে চাঁদা আদায় করা হয়। ওই জায়গাগুলোতে হকাররা বসে ব্যবসা চালান। দুই নম্বর গেট, উকিলপাড়া, নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সামনে ও মীর জুমলা সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টাভিত্তিক ও দৈনিক ভিত্তিতে জায়গা বণ্টনের অভিযোগ রয়েছে। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত কয়েক দফায় হাতবদল হয় ফুটপাত ও সড়কের জায়গা।
হকারদের অভিযোগ, তাদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হয় এবং হকার নেতাদেরও মাসোহারা দিতে হয়। এমনকি পুলিশের বিরুদ্ধেও মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া একটি প্রভাবশালী মহলের নেতারা এই টাকার ভাগ পায়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে হকার সমস্যায় ভোগান্তিতে ছিল নগরবাসী। আর হকার সমস্যার কারণে ১০ মিনিটের সড়ক পার হতে ৩০-৪০ মিনিটের অধিক সময় লেগে যেত। এছাড়া যানজট ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। এ নিয়ে হকার সমস্যা এখন নগরবাসীর কাছে গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে।