নারায়ণগঞ্জে বিগত ৬ বছর ৫ মাসে ৩ হাজার ৬২০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে নারী-শিশু সহ ১৮৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতি বছর গড়ে ৫৯০ টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে, আর তাতে গড়ে ৩০ জন প্রাণ হারাচ্ছেন এ জেলায়। এসব ঘটনার মধ্যে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারাচ্ছেন। যেকারণে জনসচেতনতা ও অবহেলাকে দায়ী করছেন তদন্তকারী সংস্থা ফায়ার সার্ভিস সহ সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া এ শহরের ঘিঞ্জি এলাকায় গড়ে ওঠা কলকারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ এড়িয়া হিসেবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে ৫৯৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে ৪২ জন মারা গেছে, ২০২১ সালে ৬৯৪ টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৭০ জন, ২০২২ সালে ৫৯৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৮ জন ও ২০২৩ সালে ৫৬৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৩২ জন, ২০২৪ সালে ৬১৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫ জন, ২০২৫ সালে ৪৭৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৮ জন, ২০২৬ সালে ৭৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৩ জন মারা গেছেন। সে হিসেবে নিহতের সংখ্যা ১৮৮ জন। এছাড়া দগ্ধ হয়ে আরও অনেকে আহত হয়েছেন।
সর্বশেষ গত ১৩ মে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মেঘনাঘাট এলাকায় অবস্থিত জেরা মেঘনাঘাট পাওয়ার প্লান্ট সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে প্রতিষ্ঠানটির ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অগ্নিদগ্ধ হন। আহতদের উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন জনের মৃত্যু হয়।
এর আগে গত ১১ মে ফতুল্লার কুতুবপুরের লাকী বাজার এলাকায় গ্যাস লিকেজ থেকে সৃষ্ট আগুনে বাবা-ছেলেসহ চারজন দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে শুক্রবার (১৫ মে) দগ্ধ বাবা আব্দুল কাদের মৃত্যুর করেন।
গত ১০ মে সকালে ফতুল্লার উত্তর ভূইগড় এলাকার গিরিধারা এলাকার একটি আটতলা ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাটে গ্যাস লিকেজ থেকে আগুন লাগে। এতে একই পরিবারের শিশুসন্তানসহ পাঁচজন দগ্ধ হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সবজি বিক্রেতা কালাম সহ পরিবারের সবার মৃত্যু হয়।
গত বছর ৩ মার্চ সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলে গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের আটজন দগ্ধ হন। পরে শিশুসহ চারজন মারা যান।
একই বছরের ২৩ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জের হীরাঝিল এলাকায় গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজ থেকে আগুনে একমাস বয়সী শিশুসহ একটি পরিবারের নয়জন দগ্ধ হন। ওই ঘটনায় মোট সাতজনের মৃত্যু হয়।
২০২১ সালের ৮ জুলাই রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকায় হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানার ছয়তলা ভবনে আগুন দেখে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে তিন জনের মৃত্যু হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট ১৯ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ততক্ষণে আগুনে পুড়ে ৫১ জনের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে ৫৪ জন শ্রমিক-কর্মচারী নিহত হয়েছেন। এমনকি অনেকের লাশ পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে, যা পরবর্তীতে ডিএনএ টেস্ট করার মধ্য দিয়ে শনাক্ত করা হয়েছে।
২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার তল্লা বাইতুস সালাত জামে মসজিদে এশার নামাজ পড়ার সময় জমে থাকা গ্যাস থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের ভেতরে থাকা মানুষের শরীর ঝলসে যায়। কারও কারও শরীরে কোনো কাপড়ই ছিল না। এরপরেই এলাকাজুড়ে শুরু হয় হুড়োহুড়ি। ঝলসে যাওয়া ৩৭ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে কয়েকজন সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পারলেও ৩৪ জন প্রাণ হারান।
এ জেলায় সবচেয়ে বেশি অগ্নি ঝুঁকিতে রয়েছে শহরের নয়ামাটি হোসিয়ারি এলাকা, ফতুল্লা পঞ্চবটি এলাকার বিসিক শিল্প নগরী, সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেড সহ বিভিন্ন এলাকা। এসব শিল্পাঞ্চল এলাকা ও তার আশেপাশে লাখ লাখ শ্রমিক বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। এরুপ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কোন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছতে অনেক বেগ পোহাতে হয়। ঘিঞ্জি এলাকা, অপ্রশস্ত সড়ক, ভবনের সরু সিঁড়ি, বহুতল ভবন ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে যথাযথ পানির রিজার্ভার না রাখা সহ নানা সংকটের কথা জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস। ফলে এরুপ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের মত ঘটনা ঘটলে বিপুল পরিমাণে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহত হওয়ার আশঙ্কা করছে ফায়ার সার্ভিস।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন বলেন, নারায়ণগঞ্জে অগ্নি ঝুঁকিতে রয়েছে অনেক ভবন। বিশেষ করে নয়ামাটি এলাকায় ঘিঞ্জি পরিবেশে দুই থেকে আড়াই হাজার হোশিয়ারি কারখানা রয়েছে। ভবন তৈরির সময় অনেকে গাড়ি প্রবেশের জায়গা রাখেনা, এলাকাগুলোতেও একই দৃশ্য। ফলে দুর্ঘটনা কবলিত এলাকা ও ভবনে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যেতে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এমনও অনেক সড়ক আছে, যেখানে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করা অসম্ভব। এ বিষয়ে মিটিং করে জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।
গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সচেতনতার অভাবের সাধারণত গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের মত ঘটনা ঘটছে। গ্যাসের রাইজার কিংবা সিলিন্ডারের লাইন থেকে লিকেজ, কিংবা ভুলবশত গ্যাসের চুলার সুইচ পুরোপুরি বন্ধ না করার ফলে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। তবে গ্যাস লাইন লিকেজ এর বিষয়টা বদ্ধ ঘরে হলেই বিপদ, বদ্ধ ঘরে লিকেজ থেকে গ্যাস জমাট বেঁধে চেম্বারে পরিণত হয়, যা আগুন বা স্পার্কের সংস্পর্শে আসলে ৫ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে বিস্ফোরণ হয়। একারণে রান্না ঘরের জানালা খোলা রাখা, গ্যাসের রাইজার রান্না ঘরের পাশে না রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকি। ফলে দুর্ঘটনার সংখ্যা কমিয়ে আনতে জনগণকে আরো সচেতন হতে হবে।
গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি নারায়ণগঞ্জের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী রাজীব কুমার সাহা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা ও পুরনো গ্যাসলাইন সংস্কারের কাজ চলমান রয়েছে। তবে অগ্নিদুর্ঘটনার জন্য এককভাবে কোন সংস্থাকে দায়ী করলে হবে না। এ জন্য ব্যবহারকারীদের অসচেতনতাও অনেক বড় কারণ। অনেক সময় দেখা যায়, চুলা বা সিলিন্ডারের চাবি ঠিকমত বন্ধ না করা এবং রান্না ঘরের জানালা খোলা না রাখার কারণে গ্যাস জমে বিস্ফোরণের মত ঘটনা ঘটছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) জেলার সভাপতি সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বেশি হলেই সবার টনক নড়ে। এরপর কিছুদিন পর সবাই ভুলে যায়। যেকারণে স্থায়ীভাবে কোন সমাধানে আসছেনা। তবে পরিকল্পিতভাবে নগর ও ভবন গড়ে না ওঠার কারণে এ জেলার অনেক এলাকা অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এ জন্য রাজউক, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন সহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে কাজ করতে হবে। যদিও বিগত সরকার আমলে এসব ক্ষেত্রে তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। তবে এখন পরিবর্তনের সময় এসেছে। আর সেই কাঙ্খিত পরিবর্তন না আসলে পুনরায় হয়তো লাশের মিছিল দেখতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং হয়েছে। তিতাস কর্তৃপক্ষকে লাইন মেরামত সহ প্রযোজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও নজরদারি বৃদ্ধির জন্য রাজউককে বলা হয়েছে।