স্টাফ রিপোর্টার: বৈষম্যবিরোধী হত্যা সহ একাধিক মামলার আসামি নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সুফিয়ানকে এবার প্রকাশে দেখা গেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, হত্যা সহ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতা হত্যার ঘটনায় আসামি হলেও কিভাবে আওয়ামী লীগের সুপরিচিত ও পদধারী নেতা আবু সুফিয়ান প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে। তার এই দুঃসাহসের অন্তরালে কারা তাকে শেল্টার দিচ্ছে। আর তাকে কেন পুলিশ প্রশাসনের লোকজন খুঁজে পাচ্ছেনা। এরুপ নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে।
জানা গেছে, সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের টানবাজার এলাকায় পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সুফিয়ানকে। কালো শার্ট ও প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় তাকে হেটে যেতে দেখা গেছে। এ সময় পাশ থেকে কে বা কারা একটি ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়, যা পরে ভাইরাল হয়।
এদিকে যুবলীগ নেতা জহিরুল ইসলাম ভ‚ইয়া পারভেজ গুমের ঘটনায় আবু সুফিয়ানকে প্রধান আসামি করা হয়। এছাড়া জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর হত্যা সহ একাধিক মামলায় তাকে আসামি করা হয়। এরপর থেকে তিনি আত্মগোপণে ছিলেন।
২০২৪ সালের ২১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শফিকুল ইসলাম নিহতের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে। সেই মামলায় আবু সুফিয়ানকে আসামি করা হয়। নিহত শফিকুলের স্ত্রী তাছলিমা আক্তার বাদী হয়ে আড়াইহাজার থানায় হত্যা মামলাটি করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, এই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল, সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, গোলাম দস্তগীর গাজী, নজরুল ইসলাম (বাবু), কায়সার হাসনাতসহ ৪৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে আছেন শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমান, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সুফিয়ান, মহানগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন ভ‚ঁইয়া, আড়াইহাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র সুন্দর আলী, ফেনী পৌরসভার সাবেক মেয়র আলাউদ্দিন প্রমুখ।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ৫ আগস্ট তাঁর স্বামী শফিকুল, ভাশুর–দেবরসহ সচেতন নাগরিক হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের নির্দেশে আসামিরা সন্ধ্যায় আড়াইহাজার উপজেলার বালুয়াকান্দী গ্রামে তাঁর স্বামীকে গালিগালাজ করতে থাকেন। শফিকুল গালমন্দ করতে নিষেধ করায় আসামিদের নির্দেশে আনসার আলীর হুকুমে রিফাতের হাতে থাকা চায়নিজ কুড়াল দিয়ে কোপ দিয়ে তাঁকে রক্তাক্ত জখম করা হয়। পরে আসামি ইয়াসিন তাঁর স্বামীর মুখে গামছা বেঁধে দেন, যাতে আওয়াজ না হয়। ঘটনাস্থলেই তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়।
এছাড়া ২০২৪ সালে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন একেএম আবু সুফিয়ান। সে সময় তার বিরুদ্ধে মামলার তথ্য গোপন করার অভিযোগে নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়, নির্বাচনী আইন অনুযায়ী প্রত্যেক প্রার্থীকে তার নির্বাচনী হলফনামায় সকল ব্যক্তিগত তথ্য নির্ভুল ও সঠিকভাবে উপস্থাপন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এ কে এম আবু সুফিয়ান আসন্ন বন্দর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। কিন্তু এ কে এম আবু সুফিয়ান নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার আই.আর নং-১৪, ০৫ই ডিসেম্বর ২০১৯ ইং সময় ১৫ টা ৩০ ধারা: ১৯-৯ ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন তৎসহ ১৪৩/১৪৪/১৪৯/৩২৩/৩২৪/৩২৬/৩০৭/৩৪, পেনাল কোড ১৮৬০ মামলার বিবরণটি তার জমাকৃত মনোনয়নপত্রে উল্লেখ করেন নাই। যা নির্বাচনী আইনের পরিপন্থী।
জানা গেছে, আবু সুফিয়ান নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে স্থানীয় যুবলীগ ও সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে ম‚লত সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর অনুসারী ও ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এমনকি ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময়ে আইভীর সাথে সুফিয়ানের বেশ সুসম্পর্ক ছিল। সে সময় আইভীর নাসিক নির্বাচনে সকল কার্যক্রম ও রাজনৈতিক কর্মস‚চিতে সুফিয়ানকে নিয়মিত দেখা যেত। ওই সময় সুফিয়ানকে জড়িয়ে আইভীকে নিয়ে ওসমান বলয় তীর্যক মন্তব্য সহ নানা সমালোচনা করেছেন। এরপর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদ বাগিয়ে নেন আবু সুফিয়ান। তবে এর কয়েক বছর পর অদৃশ্য কারণে দ‚রে সরে যান সুফিয়ান। এমনকি আইভীর দুঃসময়ে তাকে পাশে দেখা যায়নি। সবশেষ আইভীকে গ্রেফতার করা ও এক বছর পর জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরও তার পাশে সুফিয়ানকে দেখা যায়নি। অথচ একাধিক স‚ত্র বলছে, আইভীর পরিচয়কে ব্যবহার করে সিটি করপোরেশনের টেন্ডার থেকে শুরু করে অনেক কাজ বাগিয়ে নিত সুফিয়ান। আর এভাবেই সে আগুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেন, প্রশাসনের উচিত তাকে গ্রেফতার করা। সে আওয়ামী লীগের দোসর ছিল, তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে-এসব জানার পরও কিভাবে একজন দোসর প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। তাকে অতিশিঘ্রই আইনের আওতায় আনা উচিত।