স্টাফ রির্টোর: জনগণের জমির ওপর অবৈধভাবে আনন্দ হাউজিং প্রকল্প করায় বিক্ষুব্ধ জনতা উত্তাল হয়ে উঠেছেন। প্রকল্পের সব কার্যক্রম স্থগিত, জমির মালিকদের অধিকার নিশ্চিত, জমির মালিকদের অধিকার ক্ষুন্ন করে কোনো উন্নয়ন কর্মকা- না করার দাবি জানিয়ে জনতা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। গত শনিবার সকাল ১১টায় নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার গুতিয়াব নামাপাড়া এলাকায় আনন্দ হাউজিং প্রকল্পের গেটের সামনে এই কর্মসূচি পালন করা হয়।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, আনন্দ হাউজিংয়ের মালিক গাজী মোজাম্মেল হক পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি।
পুলিশের প্রভাব খাটিয়ে রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের গুতিয়াবো, মধুখালী, সুরিয়াবো, জাঙ্গীর, আগারপাড়া, নামাপাড়াসহ ১০টি এলাকার সাধারণ মানুষের জমি জবরদখল করে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়। একটি বড় খালসহ পাঁচটি খালও ভরাট করা হয়েছে। মূল মালিকদের টাকা না দিয়ে এসব জমি দখল করা হয়েছে। নামাপাড়া এলাকার হাজি সোলায়মান মিয়া বলেন, ‘আমার বাপ-দাদার ৯ বিঘা জমি মোজাম্মেল দখল কইরা নিছে।
কত জায়গায় গেছি, কেউ কিছু কয় না। আমাগো কি দাম নাই জীবনের? আল্লাহ ওনাদের বিচার করব।’ তিনি জানান, তাঁর মাছের খামার ছিল। এগুলো ভরাট করে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা।
এখন মানুষের জমিতে কাজ করে সংসার চালান তিনি। ছেলে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তিনি।
ভুক্তভোগী আনোয়ার হোসেন বলেন, চারদিকের যোগাযোগের সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। পানিবন্দি করা হয়েছে এসব এলাকার ১০ হাজারের বেশি মানুষকে।
উপজেলা, থানা ও ভূমি অফিসসহ কোনোদিকে যেতে দেওয়া হয় না এসব এলাকার মানুষকে। পানিবন্দি হওয়ায় বৃদ্ধা মহিলারা কোথাও যেতে পারেন না।
স্থানীয়রা জানায়, আনন্দ হাউজিং সোসাইটির নিজস্ব গু-াবাহিনী রয়েছে। তারা জমির মালিকদের প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। গাজী মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে কথা বললেই হামলা চালায়। আজকে যারা এসেছে, শুনবেন, তাদেরও হুমকি-ধমকি দেবে। থানা-পুলিশের কাছে সহযোগিতা চাইতে গেলে কোনো সহযোগিতা করে না পুলিশ। স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, ফাঁড়ির জায়গায় যে জমি, সেটাও ক্রয় করা হয়নি। জমির ভুয়া দলিল বানিয়ে জমি ক্রয়ের নাটক করা হয়। জমির প্রকৃত মালিককে জেলে দিয়ে নির্যাতন করা হয়।
হাজি আমানউল্লাহ বলেন, আনন্দ পুলিশ হাউজিংয়ের পরিচয় বলা হলেও আদতে এর এই পরিচয়ের সঙ্গে পুলিশের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এই নাম ব্যবহার করে, বেনজীরের ক্ষমতা ব্যবহার করে এসব জমি দখল করা হয়েছে। সরকারি খাসজমি দখলও করা হয়েছে। পুলিশ পরিবার পরিচয় ব্যবহার করে বালু ভরাট করে এসব জমি দখল করা হয়।
স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জমির মালিক ও কৃষকরা বলেন, ‘আমাদের জমি বুঝিয়ে না দিলে আমরা তিন শ ফিট সড়ক অবরোধসহ বড় ধরনের কর্মসূচি দেব। জমি বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন-সংগ্রাম চলবে। এদিকে মানববন্ধনের এক পর্যায়ে পুলিশ এসে গতকাল মানববন্ধন ছত্রভঙ্গ করে দেয়।’
একাধিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি আনন্দ হাউজিংয়ের মালিক গাজী মোজাম্মেল ক্ষমতার দাপট আর ঊর্ধ্বতনদের নাম ব্যবহার করে জমি দখল, নদী ভরাট এবং শত শত কোটি টাকার সম্পদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। প্রায় ২৬ বছরের চাকরিজীবনে তিনি গড়ে তুলেছেন শত শত কোটি টাকার সম্পদের সাম্রাজ্য। রাজধানীর উপকণ্ঠ রূপগঞ্জে রয়েছে নানাভাবে দখল করা প্রায় তিন হাজার বিঘার আবাসন প্রকল্প। এর পাশে প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে রয়েছে বাগানবাড়ী (বর্তমান মূল্য প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা)। বান্দরবানে এক দাগে ১৭৫ বিঘা জমি রয়েছে। সেখানে আতর চাষ করা হয়। রূপগঞ্জের জিন্দাপার্ক এলাকায়ও বিস্তর জমি রয়েছে।
একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ সদর এলাকায় তাঁর ভায়রার নামে কয়েক বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। ডেমরার সারুলিয়া টেংরায় ৩১ শতাংশ জমিতে রয়েছে মোজাম্মেলের স্ত্রীর নামে ব্রিজ ফার্মাসিউটিক্যালস। এ ছাড়া কুমিল্লার মেঘনা নদীর বুকে রিসোর্টসহ নানা সম্পদ, সুনামগঞ্জে সম্পত্তিসহ সব মিলিয়ে অবৈধভাবে গড়ে তোলা বিস্ময়কর সম্পদের তথ্য মিলেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার বিঘা জমির মালিকানা রয়েছে তাঁর পরিবারের। যার বড় অংশই কৌশলে তাঁর স্ত্রীর নামে স্থানান্তরিত করা হয়। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ত্রীর নামে সম্পত্তি দেওয়া এটি একটি পরিচিত পদ্ধতি। এর মূল কারণ অনুসন্ধান বা তদন্তের সময় দায় এড়ানো। মোজাম্মেল যেখানে জমি নিয়েছেন, সেখানেই স্থানীয়দের অভিযোগ গুরুতর। অনেককে জোরপূর্বক জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়েছে।
বাজারমূল্যের তুলনায় নামমাত্র দামে জমি নেওয়া হয়েছে। হুমকি ও মামলা দিয়ে ভয় দেখানো হয়েছে। আবার কাউকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করে জমি লিখিয়ে নিয়েছেন। একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, জমি বাঁচাতে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাননি।
রূপগঞ্জে আবাসান প্রকল্পের জন্য জোর করে জমি দখলে নিয়েছেন। দুদক সূত্র বলছে, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মো. মোজাম্মেল হক ও তাঁর স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসর সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের নামে মোট কয়েক কোটি টাকার সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, স্বামী-স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলছে। দুদক কর্মকর্তারা তাঁদের দুজনের সম্পদের বিবরণী দাখিলের নোটিশ করেছেন।
তার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা যে সম্পদবিবরণী দাখিল করেছেন, তা যাছাই-বাছাই করা হচ্ছে। গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি মোজাম্মেল হকের নামে থাকা ৬৫ বিঘা জমি জব্দের আদেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেল ও সন্তান গাজী বুশরা তাবাসসুমের নামে থাকা বেশ কয়েকটি জমি জব্দেরও আদেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের ২৮টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত।