নারায়ণগঞ্জে একের পর এক পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা বেড়ে চলেছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে গিয়ে পুলিশ কখনো হামলার শিকার হচ্ছে, কখনো আবার তাদের অস্ত্র লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। আবার কখনো পুলিশকে লক্ষ করে গুলি পর্যন্ত ছুড়ে মারছে অপরাধীরা। আর তাতে করে জনগণের মনে নানা শঙ্কা ও ভয় সৃষ্টি হয়েছে।
সবশেষ গত ১৩ জুন দিবাগত রাতে ফতুল্লার মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে সাড়ে ১৫ কেজি গাঁজাসহ তিনজন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ সময় তাদের ছাড়িয়ে নিতে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে গুলি ছুঁড়েছে তাদের সহযোগী মাদক ব্যবসায়ীরা। এতে পুলিশ কর্মকর্তা সহ ৫ জন আহত হয়েছেন।
গ্রেফতাররা হলেন- মনির ওরফে ফাইটার মনির (৩৮), নাঈম (২৮) ও মাসুম (২৪)। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মাদকের মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
আহত পুলিশ সদস্যরা হলেন-এসআই নন্দন সরকার, এসআই মনির, এএসআই কামরুল হাসান, এএসআই মনির হোসাইন এবং কনস্টেবল আশিক। তাদের শহরের খানপুর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
গত ৬ মে ফতুল্লার কাশিপুরের হাশেমবাগ এলাকায় অভিযানে গিয়ে একদল পুলিশের সদস্য অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে পড়েন। এসময় আটক পাঁচ আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। যদিও ওই ঘটনায় কোনো পুলিশ সদস্য আহত হননি।
এর আগে ৫ মে শহরের বোয়ালিয়া খাল লিচুবাগ এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ধরতে গিয়ে র্যাব সদস্যরা হামলার শিকার হন। এসময় দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তিন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। পরে যৌথবাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারসহ ১৩ জনকে আটক করা হয়।
একই দিন গভীর রাতে রূপগঞ্জের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকায় পুলিশের গাড়ি থেকে একাধিক মামলার আসামি শামীমকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে ওই ঘটনায় জড়িত ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
গত ৩০ এপ্রিল বন্দরের পুরান বন্দর এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগ তদন্তে গিয়ে সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হন পুলিশ সদস্যরা। হামলায় এক কনস্টেবলের আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
একইভাবে গত ১৫ মার্চ শহরের উকিলপাড়া রেললাইন এলাকায় দুই পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনা ঘটে। পরে রাতেই অভিযানে নেমে অভিযুক্ত দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
গত ৯ মার্চ ভোরে শহরের নিতাইগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লুৎফর রহমানকে কুপিয়ে তার অস্ত্র ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। পরবর্তীতে বন্দর থেকে অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর একের পর এক হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও বাড়ছে আতঙ্ক। স্থানীয়রা জানান, এখন আর কেউ নিরাপদ বোধ করছেন না।
একাধিক সূত্র বলছে, মাদক ব্যবসা ও আধিপত্ত বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব এলাকায় বেশ কিছু সন্ত্রাসী গ্রুপ তৈরি হয়েছে। মূলত মাদক ব্যবসাকে শেল্টার দিতে এসব মাদক ব্যবসায়ীরা বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলে। এছাড়া দুই দশকের বেশি সময় ধরে এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সন্ত্রাসী বন্দুক শাহীনের উত্থান
নব্বইয়ের দশকের শেষ সময়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের গলাচিপা ও মাসদাইর সহ আশেপাশের এলাকার সন্ত্রাসী মনিরুজ্জামান শাহীন ওরফে বন্দুক শাহীনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসীপনা ছিল তার মূল কাজ। ১৯৯৬ সালে পুলিশের একটি থ্রি নট বন্দুক লুট করার পর শাহীনের নামের সঙ্গে যুক্ত হয় বন্দুক শব্দটি। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার গঠন করলে শাহীন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ২০১৩ সালে পুরো জেলার ইয়াবা ও ফেনসিডিলের একক আধিপত্য চলে আসে বন্দুক শাহীনের কাছে। তখন থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর হামলা করতো শাহীনের লোকজন।
২০১৩ সালের ৩ মে মাসদাইরে একই স্থানে ডিবির অভিযানের সময় তাদের উপর হামলা করে শাহীনের লোকজন। ২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে শাহীনকে আটক করতে শাহীনের লোকজন র্যাব সদস্যদের ডাকাত আখ্যা দিয়ে মারধর করে এবং তাদের একটি মটরসাইকেল পুকুরে ফেলে দেয়। ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শাহীন সহ আরো ১০-১২জন অস্ত্র নিয়ে পুলিশের উপর হামলা করে।
২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ডিবির প্রায় ১২ মিনিটি ধরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এক সময়ে শাহীন ক্রসফায়ারে মারা যান। পুলিশের ভাষ্য মতে, ভোরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শহরের গলাচিপা এলাকায় বন্দুক শাহীনের মাদকের আস্তানায় অভিযান চালাতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা চালায় শাহীন ও তার সহযোগীরা। দুই পক্ষের গোলাগুলিতে শাহীন নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি ৭ পয়েন্ট ৬৫ বোরের পিস্তল ও ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। শাহীনের বিরুদ্ধে একাধিক থানায় হত্যা, মাদক, চাঁদাবাজিসহ ১২টির বেশি মামলা রয়েছে।
আলোচিত হত্যাকাণ্ডের খুনিরা অধরা
সন্ত্রাসী বন্দুক শাহীনের জনপদ হিসেবে পরিচিত মাসদাইর এলাকায় আলোচিত ব্যবসায়ী সাব্বির আলম খন্দকারকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। জানা গেছে, ২০০২ সালের ২২ অক্টোবর সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও মাদক মুক্ত করার জন্য নারায়ণগঞ্জ চেম্বারে অনুষ্ঠিত জেলার ৩২টি ব্যবসায়ী সংগঠনের সাথে সেনাবাহিনীর মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় অংশ গ্রহণ করার আহবান জানিয়ে বক্তব্যে সাব্বির সেদিন সন্ত্রাসী মাদক ব্যবসায়ীদের নাম, ঠিকানা ও তাদের গডফাদারদের নাম প্রকাশ করেন।
এ ঘটনার চার মাস পর ২০০৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী সকালে মাসদাইরে নিজ বাড়ির অদূরে মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত রোকেয়া খন্দকার স্কুল থেকে বের হওয়ার ৫ থেকে ৭ গজ দূরেই আক্রান্ত হন সাব্বির আলম খন্দকার। অজ্ঞাত দুই সন্ত্রাসী প্রথমে সাব্বিরকে লক্ষ্য করে ২ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। সাব্বির তখন দৌড় দিলে সন্ত্রাসীরা পেছন থেকে খুব কাছ থেকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য গুলি ছোড়ে। পিঠে, পেটে, মাথায় ও হাতে ২১টি গুলির চিহ্ন রয়েছে। তার মৃত্যুর পর থেকে এখন পর্যন্ত দুই খুনির সন্ধান মেলেনি। পরিচয় উন্মোচিত হয়নি।
সন্ত্রাসী বন্দুক শাহীনের মৃত্যুর পর জাহিদ গ্রুপের উত্থান
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্ত্রাসী বন্দুক শাহীনের মৃত্যুর পর হাতবদল হয়ে তারই ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত জাহিদ, মাসুদ ওরফে ‘বুইট্টা মাসুদ’ ও খাঁজা রনি -এর নিয়ন্ত্রণে চলে যায় মাসদাইরের মাদকের স্পটগুলো। মূলত জাহিদ গ্রুপের সাব গ্রুপ হলো বুইট্টা মাসুদ ও রনি গ্রুপ। পরবর্তীতে তারা সেখানে মাদকের নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। আর সেই সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে অস্ত্র ও সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলে।
গত বছরের ১৫ নভেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় মাসদাইর এলাকায় নাসিক ১৩নং ওয়ার্ড কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাহিদুর রহমান পারভেজের ওপর ছুরিকাঘাত ও গুলিবর্ষণ করে জাহিদ গ্রুপের জাহিদ ও তার সহযোগীরা। এ ঘটনায় আসামিদের গ্রেফতার করতে
১৬ নভেম্বর র্যাব-১১ এর একটি গোয়েন্দা দল শহরের মাসদাইরের গাইবান্ধা বাজার এলাকায় পৌঁছালে জাহিদ ও তার সহযোগীরা র্যাবের গোয়েন্দাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গুলি ছুড়ে। এসময় জাহিদের ছোড়া গুলি স্থানীয় এক বাড়ির রান্নাঘরে থাকা জবা আক্তার (২২) নামে এক গৃহবধূর বুকে এসে লাগে। পরে তাকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
গত বছরের ২৪ জুলাই ফতুল্লা মডেল থানার এসআই সামছুল হক সরকার সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে মাসদাইর ঘোষের বাগ এলাকায় মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি জাহিদকে গ্রেপ্তার করতে যান। জাহিদকে ঘটনাস্থলে না পেয়ে তারা যখন ফিরে আসছিলেন, তখনই পেছন থেকে জাহিদের সহযোগীরা এসআই সামছুল হক সরকারের ডান হাতের কনুইয়ের নিচে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। ছুরিকাঘাতে আহত এসআই সামছুল হক সরকারকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
গত বছরের ১৮ মার্চ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে জাহিদ, সুমনসহ চার জন আসামিকে গ্রেফতার করে। এর কিছুক্ষণ পর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী সেলিম ওরফে কসাই সেলিম, রাসেল ওরফে কসাই রাসেল, কাজল, রিয়াদ শাওন, সানি, হাসান সহ ১৫-২০ জনের মাদক কারবারিদের একটি গ্রুপ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় হামলাকারীরা হ্যান্ডকাফ পরিহিত গ্রেফতারকৃত চার মাদক ব্যবসায়ীকে ছিনিয়ে নেয় এবং গাড়ী ভাঙচুর করে। মাদক কারবারিদের হামলায় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কনেস্টেবল আহত হয়। এ ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার করে।