নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কাশীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফ মন্ডলের ললাটে কলঙ্কের তীলক এটে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কাশীপুর জুড়ে তাণ্ডব চালাতে শুরু করে এই আরিফ মন্ডল ও তার অনুসারীরা। কাশীপুরের ৯টি ওয়ার্ড জুড়ে মিনি ফ্যাক্টরী, বড় বড় গার্মেন্টস, ইট-বালুর ব্যবসা, ডিস-ইন্টারনেট, ভূমিদস্যূ সিন্ডিকেট, ২টি ইজারাদারকৃত বাশেঁর ব্রিজ, ওরিয়ন, বর্জ্য খাতের টাকা, বিভিন্ন সেক্টর থেকে চাঁদাবাজি সবই তার নিয়ন্ত্রণে। ফতুল্লায় তার নেতৃত্বে মাটির নিচের ক্যাবল চুরি করে যাচ্ছে তার অনুসারীরা। এতো বিতর্কিত কর্মকান্ড সত্ত্বেও এই নেতা রয়েছে বহাল তবিয়তে। এতে প্রশ্ন উঠছে। এই নেতার ক্রমশ বেপরোয়া হয়ে উঠার পেছনে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার নাম উঠে আসছে। ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম টিটুর পাশে তাকে দেখা গেছে। এছাড়া সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিএনপি দলটির শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর পাশে এই আরিফ মন্ডলকে দেখা গেছে। ফলে এ নিয়ে প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কাশীপুর ২নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা শহীদ ভেন্ডারের ছয় তলা ভবনে তালা লাগিয়ে দেয় আরিফ মন্ডল ও তার লোকেরা। পরবর্তীতে মোটা অংকের চাঁদা নেওয়া হয় ভবন মালিকের কাছ থেকে।
এছাড়াও কাশীপুরের আওয়ামী লীগ নেতা শফির বাড়ীতে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। এতে ১৬ ভরি স্বর্ণ ও নগদ টাকা লুটে নেয়ার অভিযোগ তোলেন শফির পরিবার। শান্তিনগর এলাকায় কামালের বাড়ীতে গিয়ে হামলার হুমকির মাধ্যমে চাঁদা দাবী করে আরিফ মন্ডল। ২নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ইসলাম ও মুসলিমের বাড়ীতে গিয়ে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। একটি অটো গ্যারেজে চাঁদা আদায় এবং ব্যাটারী লুটে নেয় তার লোকেরা।
ভোলাইল ও মরাখালপাড় এলাকায় গিয়ে বিভিন্ন ভবন মালিকদের কাছ থেকে চাঁদাবাজীর অভিযোগ রয়েছে আরিফ মন্ডলের বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও বিভিন্ন গার্মেন্টস ও ডাইংয়ে গিয়ে ওয়েস্টিজ ব্যবসার নিয়ন্ত্রনে নিয়েছে। পাশাপাশি শান্তিনগর এলাকায় একটি দোকান মালিকের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।
এমনকি ২ কাশীপুরের স্টার ব্যাটারী হাউজে লুটপাট চালানোর অভিযোগ রয়েছে। এদিকে সাইফুল্লাহ বাদলের ছেলে সাজনকে সাথে নিয়ে ভোলাইল এলাকায় বর্জ্য সিন্ডিকেট চালু করেছেন। একই সাথে গেদ্দারবাজার এলাকায়। তৈরী করেছে সন্ত্রাসী বাহিনী যাদের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় মহড়া দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে সাধারণ জনগণকে ভীত রেখেছেন এই আরিফ মন্ডল। বর্তমানে কাশীপুরে আতঙ্কের নাম আরিফ মন্ডল।
কিছুদিন পূর্বে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কাশিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো.আরিফ মন্ডলকে ফেন্সিডিলসহ আটক করা হয়েছে এমন একটি ছবি পুরো ফেসবুক জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, দুই পাশে দুইজন পুলিশ সদস্য এবং টেবিলের উপর সাজানো ফেন্সিডিলের বোতলের সামনে আরিফ মন্ডলসহ অপর এক যুবককে।
জানা গেছে, এক সময়ে কাশীপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি থাকাবস্থায় কাশীপুরের ইতিহাসে সব থেকে বড় ফেন্সিডিলের চালান নিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন আরিফ মন্ডল। তবে সেই সময়ের এই ছবি অনেক দিন পর ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি ফতুল্লা এলাকায় ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি (ডিপিডিসি)-এর ভূগর্ভস্থ ফিডার লাইনের ডেড কেবল চুরির ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৯ মাস ধরে একটি চক্র ভেকু দিয়ে মাটি খুঁড়ে কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত ডেড কেবল তুলে নিয়ে যাচ্ছে। কখনো গভীর রাতে, আবার কখনো দিনের আলোতেও প্রকাশ্যে এই চুরি সংঘটিত হচ্ছে। বিএনপি নেতা আরিফ মণ্ডলের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট এ কাজে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তার সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতার কথাও বলছে এলাকাবাসী।
জানা গেছে, ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জ-পঞ্চবটি দ্বিতীয় সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হলে খোঁড়াখুঁড়ির সময় কেবলগুলো দৃশ্যমান হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জুন থেকে কাশীপুর ইউনিয়নের কয়েকজন ব্যক্তি ভেকু ব্যবহার করে এসব ডেড কেবল উত্তোলন শুরু করেন। শুরুতে কেবল বিক্রির অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে চক্রের ভেতরে দ্বন্দ্বের ঘটনাও ঘটে। পরে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যারা নিয়মিত কেবল তুলে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তিকে ম্যানেজ করেই এই চুরি চালানো হচ্ছে। বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ পেলেও দৃশ্যমান কোনো অভিযান না হওয়ায় রহস্য আরো ঘনীভূত হয়েছে।
এ বিষয়ে ফতুল্লা সাবস্টেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এইচ এম তারেক তুষার বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে লোক পাঠিয়ে কেবল চুরির সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে চক্রটি সংঘবদ্ধ হওয়ায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, আমাদের লোকজন ছবি তুলতে গেলে তাদের বাধা দেওয়া হয় এবং মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত দিনে আওয়ামী লীগের ছত্র-ছায়ায় থেকে ব্যবসা বাণিজ্য সচল রেখেছিলেন তিনি। বর্তমানে সাবেক চেয়ারম্যান বাদল পুত্র সাজনকে সাথে নিয়ে কাশীপুরে নানাভাবে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তবে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরই এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া হয়ে উঠে আরিফ। তিনি বর্তমানে কাশীপুরে ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম টিটুর নাম বিক্রি করেই সকল অপকর্ম করছেন। এদিকে আরিফ মন্ডল প্রতিমাসে এভাবে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কাশীপুর থেকে।
সূত্র বলছে, আরিফ মন্ডল এক সময় যুবদলের রাজনীতিতে ছিলেন। ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহীদুল ইসলাম টিটুর সাথে তার গভীর সখ্যতা রয়েছে। টিটু যুবদলের নেতৃত্বে থাকাবস্থায় আরিফ মন্ডল তার কর্মী ছিলেন। টিটু ফতুল্লা থানা বিএনপির আহবায়ক হওয়ার পর আরিফ মন্ডলকে কাশীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদে আদিষ্ঠ করেন। এদিকে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর একটি পক্ষ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় এবং জেলা পর্যায়ের নেতারাও বিএনপির কর্মীদের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেয়ার বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন।
তবে দলের সেই নির্দেশনাকে তোয়াক্কা না করে আরিফ কাশীপুরে বিএনপির নাম ব্যবহার করে মানুষের বাড়ি-ঘরে হামলা, লুটপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, দোকানে দোকানে চাঁদাবাজিসহ এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেছে। এতে বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষের নেতিবাচক মনোভাব তৈরী হচ্ছে।
সম্প্রতি আরিফ মন্ডল কাশিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার জন্য বিভিন্ন পোস্টার-ব্যানার সাটিয়েছেন। সেই পোস্টারে বিএনপি দলীয় প্রতিক ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এই বিতর্কিত নেতা। এ নিয়ে চারদিকে নানা আলোচনা ও সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে আরিফ মন্ডলের মত বিতর্কিত নেতার কারণে বিএনপি দলটির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে।