নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার বক্তাবলী এলাকায় ছয় বছরের শিশু আফসানা আক্তার খাদিজাকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে হিরু নামে এক যুবককে ধরে নিয়ে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনা নতুন মোড় নিয়েছে। ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি ডাক্তারি রিপোর্টে। এ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে পাল্টা নানা অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, গত ২২ মে সন্ধ্যায় ২০ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে ছয় বছরের শিশুকে একটি ক্ষেতের নির্জন স্থানে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ উঠে দুই যুবকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার পর শিশুটি বাড়ি ফিরে গেলে তার মা বিষয়টি বুঝতে পেরে ধর্ষণের অভিযোগ তোলেন। ওই রাতে ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। আর অভিযুক্ত হিরোকে আটক করে গাছের সঙ্গে বেঁধে গণপিটুনি দেয় ভুক্তভোগীর স্বজন ও স্থানীয় জনতা। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করে পুলিশ। একই ঘটনায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে অপর অভিযুক্ত সোহেলকে আটক করে।
এ ঘটনার পরদিন ভুক্তভোগী শিশুটির মা বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন। মামলায় হিরোকে প্রধান আসামি এবং ধর্ষণে সহযোগিতা করার অভিযোগে একই এলাকার জামাল হোসেনের ছেলে সোহেলকে দুই নম্বর আসামি করা হয়। সেই মামলায় আসামি সোহেল বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।
এদিকে মামলার সূত্রে জানা যায়, মেডিকেল রিপোর্টে ধর্ষণের সুস্পষ্ট আলামত পাওয়া যায়নি। তবে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টার চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা: আবুল ফজল মুহাম্মদ মুশিউর রহমান ২৪ মে মেডিকেল রিপোর্ট ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের কাছে পাঠিয়েছে।
চিকিৎসকের মতে, শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়নি। তবে শিশুটির শরীরে আচরের চিহ্ন রয়েছে। সে হিসেবে প্রতিবেদনে ধর্ষণ চেষ্টার কথা বলা হচ্ছে। তবে ধর্ষণ চেষ্টার বিষয়টি আরও অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে স্পষ্ট করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। তাছাড়া এ ধরণের আলামত অনেক সময় ফেকও হতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ফতুল্লা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, এ ঘটনায় মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ী ধর্ষণের আলামত মেলেনি। তবে ধর্ষণ চেষ্টার আলামত মিলেছে। শুনেছি নিহতের পরিবার আদালতে হত্যা মামলা করেছে।
নিহত হীরুর পরিবারের দাবি, ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে হিরুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। গণপিটুনির ঘটনার পর তাদের বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এছাড়া ঘরে থাকা নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান মালামাল লুট করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
অন্যদিকে, ভুক্তভোগী শিশু আফসানার মা সাবানা আক্তার দাবি করেন, তার মেয়েকে নদীর পাড়ের একটি পাটক্ষেতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়। তিনি জানান, ঘটনার পর শিশুটির গোপনাঙ্গে রক্তের চিহ্ন দেখতে পান এবং তা পরিষ্কার করেন। তবে আফসানার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সে নিজেই পানি দিয়ে স্থানটি পরিষ্কার করেছিল।
এ ঘটনাকে ঘিরে ভিন্নমতও রয়েছে। আফসানার চাচির দাবি, অভিযোগের পর শিশুটিকে তার কাছে নিয়ে আসা হলে তিনি কোনো ধরনের স্পষ্ট আলামত দেখতে পাননি। এছাড়া স্থানীয় অনেকের দাবি, পূর্ব বিরোধের জেরে একটি পক্ষ ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে।
একাধিক সূত্র বলছে, পূর্বশত্রুতাকে কেন্দ্র করে মব সৃষ্টি করে তাকে পিটুনি দিয়ে মারা হয়েছে। তবে এই ঘটনার সাথে জমি সংক্রান্ত পূর্ব বিরোধী নাকি পারিবারিক বিরোধ রয়েছে তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।