1. voiceofnarayanagnj24@gmail.com : Salim Ahmed Dalim : Salim Ahmed Dalim
  2. info@ajkerdeshkantho.com : Rabbi630 :
আতঙ্কের মদনপুরে দুই যুগে ২২ খুন - Ajker Deshkantho
বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০৪ অপরাহ্ন

আতঙ্কের মদনপুরে দুই যুগে ২২ খুন

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মদনপুর অঞ্চলটি খুন আর রক্তপাতের এক নগরী হিসেবে আতঙ্কের নামে পরিণত হয়েছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, পরিবহন সেক্টর, জমি দখলসহ মাদক ব্যবসা, নানা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হত্যা যেন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমন একটা সময় গেছে মদনপুরের মুরাদপুর, চাঁনপুর, ফুলহর, হরিপুর এলাকায় সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতে সাহস পেত না। ত্রাস, খুন, চাঁদাবাজিসহ নানা অপ্রীতিকর ঘটনার ফলে বন্দরের উত্তরাঞ্চল সন্ত্রাসী ও অন্ধকার নগরীতে পরিণত হয়েছিল। সর্বশেষ এই অঞ্চলে হিন্দি ফিল্মি স্টাইলে পরিবার-স্বজনদের সামনে মনুকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা পুরো জেলাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এই নির্মম ঘটনা সহ একই পরিবারের ৭ জনকে হত্যার মধ্য দিয়ে পুরো পরিবার পুরুষ শূন্য করা হয়েছে। এতেই আসামিরা খ্যান্ত হয়নি। পরিবারের সদস্যদের নানাভাবে হুমকি সহ ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছেন। স্থানীয়দের দাবি, গত দুই যুগে এই অঞ্চলে অন্তত ২২ জন খুন হয়েছে।

স্ত্রী-সন্তানের সামনে মনুকে নৃশংস হত্যা

২০২৪ সালের ৭ জুন নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে মনিরুজ্জামান মনু (৩৮)–কে। যে উঠানে তাকে খুন করা হয়, সেটিই তার পৈতৃক ভিটা। এ ঘটনার একটি ভীতিকর পরিস্থিতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পেলেও আজও বিচার মেলেনি।

নিহতের স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, বিয়ের পর থেকেই নরসিংদিতে থাকতাম। স্বামীর প্রাণনাশের ভয় ছিল সবসময়। যা ভাবছিলাম তাই হলো। জানাজা উপলক্ষে ৬ জুন মনু নারায়ণগঞ্জে আসেন। রাতে তিনি নিরাপত্তার জন্য বন্ধুর বাড়িতে থাকলেও পরদিন স্ত্রী-সন্তানদের আনতে নিজের বাড়িতে যান। অভিযোগ, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নয়ন পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী মনুর অবস্থান শত্রুপক্ষকে জানিয়ে দেন। অর্থের লোভে মনু হত্যায় সহযোগিতার জন্য নয়ন নেন ১০ লক্ষ টাকার প্রতিশ্রুতি এমনটাই অভিযোগ চার্জশিটে।

স্ত্রী-সন্তানের সামনে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় মনুকে। পরিবারের সদস্যরা বাধা দিলে তাদের ওপরও চলে নির্যাতন।

পুলিশ চার্জশিটে জানিয়েছে-সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল ভিডিওতে দেখা যায়, আসামি টিটু, জনি, মোজ্জামেল, ফরহাদ, রাসেলদের ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে। আসামি রাহাত, নাঈম, কাউসার, ইউনুছ দৌড়ে ঘটনাস্থলের দিকে যেতে দেখা যায়। ঘটনার সময় মিঠুর পরনে ছিল নীল লুঙ্গি ও কফি-ক্রিম রঙের টি-শার্ট, টিটুর ছিল ক্রিম রঙের টি-শার্ট ও কালো-ব্রাউন শর্টস।১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে কয়েকজন আসামি হত্যায় অংশগ্রহণের কথা স্বীকার করেছে। চার্জশিটে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—গেট ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে মনুকে মারধর করা হয়, পরে বাইরে এনে পিটিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

এক পরিবারের আরও সাতজন নিহত

জানা গেছে, মনু ছিলেন পরিবারের শেষ পুরুষ সদস্য। এর আগেই খুন করা হয়েছে তার মা ফুলমতি বেগম, বাবা কামাল উদ্দিন, দুই ভাই—নূরা ও বাবুল (২০০৩ সালে প্রকাশ্যে গুলি ও কোপানো), দুই বোন নিলুফা ও রেহেনা (একজনের মরদেহ মিলেছে, অন্যজন নিখোঁজ দীর্ঘদিন)।

এই অঞ্চলের খুনের ইতিহাস অনেক আগে থেকে শুরু হয়েছে। জানা গেছে, ২০২১ সালের ৭ এপ্রিল বন্দরের মদনপুর এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও ড্রেজার ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের সংঘর্ষে জুয়েল মিয়া নামের (২৫) এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহত জুয়েল মিয়া মদনপুর ইউনিয়নের আন্দিরপাড় এলাকার আনোয়ার হোসেনের ছেলে। ৭ এপ্রিল রাত আনুমানিক ১০টার দিকে মদনপুর ইউনিয়নের সাইরাগার্ডেন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বন্দরের মদনপুরে ইউপি সদস্য খলিলুর রহমানকে কুপিয়ে জখম করার ঘটনার রেশ না কাটতেই তার বাহিনী মাদক ব্যবসায়ীকে ছাড়িয়ে নিতে পুলিশের উপর হামলা করে। ১২ জানুয়ারির সংঘর্ষের এই ঘটনায় পাল্টাপাল্টি গুলি বিনিময় হয়। এতে শাকিল নামের এক যুবক নিহত হয় ও বাবু নামের আরেকজন গুলিবিদ্ধ হওয়ায় চিকিৎসাধীন ছিল। এদিকে আহত পুলিশের দুই সদস্য দেবাসীশ ও মনোয়ার বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিল। দেবাসীশের মাথায়, মুখে ও শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। সন্ত্রাসী ও মাদক বিক্রেতাদের হাতে পুলিশ রক্তাক্ত জখম হলেও বহাল তবিয়তে ঘটনার মূলহোতা খলিল ওরফে বরকি খলিল মেম্বার। এককালের সন্ত্রাসের জনপদখ্যাত বন্দরের উত্তরাঞ্চল তথা মদনপুরে খলিল বাহিনীর উত্থানের পর পুণরায় আতংকের জনপথে পরিণত হয়েছে। কামু-সুরত আলী বাহিনীর অবসান হলেও নব্য গডফাদার রূপে নিজেকে জাহির করতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে খলিল মেম্বার ওরফে বরকি খলিল।

জানা গেছে, ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মদনপুরে একটি রেষ্টুরেন্ট থেকে খলিল মেম্বারের মাদক সিন্ডিকেটের নূর নবী ও রিফাত নামের ২ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এ খবর স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়লে খলিল মেম্বারের সহযোগী চাঁনপুর এলাকার মতিনের ছেলে সুজন, দিপু, মাইনুদ্দিন, সেলিম, মুকুল, হান্নান, মনির, কানা মতিন, মারুফ, আনোয়ারসহ ২৫/৩০ জন এসে পুলিশকে ঘিরে রাখে। তারা আটক দুইজনকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এসময় পুলিশ বাধা দিলে পুলিশের উপর হামলা করে মাদক ব্যবসায়ীরা। হামলাকারীরা পুলিশের কাছ থেকে ওয়ারলেস সেট ছিনিয় নেয়। পরে প্রচন্ড চাপের মুখে রাত সাড়ে ১০ টার দিকে খলিল মেম্বার উপস্থিত থেকে পুলিশের ওয়ারলেস সেট ফেরত দেয়।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে চাঁনপুর ও ফুলহর গ্রামের মদনপুর বাসস্ট্যান্ডের নেতৃত্বের লড়াইয়ে গত দেড়যুগে দুইগ্রুপের মধ্যে দুই নারীসহ ১৯ জন খুন হয়েছেন। এই দুই গ্রামের মধ্যে গ্রতিনিয়ত রক্তপাতের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একসময়ে আতঙ্কের নাম ছিল মদনপুর। মদনপুরের নাম শুনলেই আঁৎকে উঠতো সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। বন্দর উত্তরাঞ্চলের মদনপুর এলাকার ভয়ঙ্কর শীর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান কামরুজামান কামু ও সুরুত আলী মারা যাওয়ার পর ৫-৭ বছর এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। মদনপুর এলাকার এক শিল্পপতির পৃষ্ঠপোষকতায় চাঁনপুর গ্রামের মৃত ইয়াসিন মিয়ার ছেলে কাবিলা এক সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করে। আস্তে আস্তে সে পরিবহন সেক্টর ও স্থানীয় রেলওয়ের জমিতে গড়ে ওঠা দোকানপাটের চাঁদাবাজি তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এসব সেক্টর থেকে প্রতিমাসে ৭০-৮০ লাখ টাকার চাঁদার ভাগ বসাতে খলিল মেম্বার চাঁনপুর এলাকায় এক বাহিনী গঠন করে।

এরপর থেকে চাঁদার টাকা উত্তোলন নিয়ে দুইগ্রুপ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এ নিয়ে খলিল ও কাবিলা গ্রুপের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তারা দুইগ্রুপই ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদপুষ্ট। খলিল মেম্বার মদনপুর ইউনিয়ন ৫নং ওয়ার্ডে দুইবার নির্বাচিত হন। তিনি ওই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের স্ব-ঘোষিত সভাপতি। অন্যদিকে কাবিলা বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলের লোক বলে জানা যায়।

এলাকাবাসী জানান, ২০০০ সালের আগে উপজেলার মদনপুর মুরাদপুর গ্রামের কামালউদ্দিনকে ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। এ হত্যাকান্ডের পর থেকে কামালউদ্দিনের ছেলে কামনুজ্জামান কামু বদলা নিতে সন্ত্রাসী কার্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। এ কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিপক্ষ গ্রুপ সন্ত্রাসী কামুকে না পেয়ে তার মা ফুলবিবিকে কুপিয়ে হত্যা করে। পিতা ও মাতার হত্যার বদলা নিতে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে কামু। তার সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে যোগ দেয় তার ছোট ভাই নুরুজ্জামান নুরা, মনিরুজ্জামান মনু, বড় ভাই বাবুল আক্তার ও আবুল হোসেন। পুরো মদনপুর এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সন্ত্রাসী আধিপত্য বিস্তার ও পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজির ভাগ বসাতে প্রতিপক্ষ হিসেবে অবস্থান নেয় চাঁনপুর গ্রামের স্বর্ণ মিয়ার ছেলে সুরুত আলী। এ নিয়ে কামু বাহিনী সুরুত আলীর ভাই দলিল লেখক বাতেনকে হত্যা করে।

এরপর থেকে মদনপুর এলাকায় একের পর হত্যাকান্ড রক্তপাতের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসীদের এক রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। সুরুত আলী ও কামু দুই বাহিনীর মধ্যে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। যাকে যেখানে পাওয়া যেত সেখানেই হত্যা করা হতো। সুরুত আলী বাহিনীর হাতে কামরুজ্জামান কামুর ছোট ভাই নুরুজ্জামান নুরা ও বড় ভাই বাবুল আক্তার খুন হয়। ওই হত্যাকান্ডের কয়েক মাস পর কামুর বড় বোন নিলুফা বেগমকে তুলে নিয়ে হাত-পায়ের রগ কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয় সুরুত আলী বাহিনী। এরপর কামুর ছোট বোন রেহানা বেগমকে তুলে নিয়ে লাশ টুকরা টুকরা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এখনো লাশের সন্ধান মেলেনি। এভাবে কামু বাহিনীর সদস্য ঘোড়া দেলোয়ার, ফুলহরের শাহজাহান ও তার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মাসুদকেও খুন করা হয়। খুন করা হয়েছে ফুলহর গ্রামের ব্যবসায়ী রিপনকে।

একইভাবে সুরুত আলী বাহিনীর সদস্য জুলহাস, সামছুল হক, সুমন ও তার ভাই দলিল লেখক বাতেনকে হত্যা করে কামু বাহিনী। এছাড়াও কামুর বড় ভাই আবুল হোসেন ও ফুলহর গ্রামের আলী আহম্মদের ছেলে মুকবুল পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে। কামুর দুই ভাই ও দুই বোনের হত্যার প্রতিশোধ নিতে সুরুত আলীকে নয়াপুর এলাকায় প্রকাশ্যে হত্যা করে শরীর থেকে মাথা কেটে নিয়ে যায় কামুর বড় ভাই আবুল হোসেন। কামু স্বাভাবিক মৃত্যু ও সুরুত আলী নিহত হওয়ার পর মদনপুরের নেতৃত্ব চলে আসে চাঁনপুর এলাকার মৃত ইয়াসিন মিয়ার ছেলে বিএনপির সক্রিয় নেতা কাবিল ওরফে কাবিলার হাতে। কাবিলা উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলের লোক বলে পুলিশ প্রশাসন থেকে রক্ষা পায়। সরকারী দলের ব্যানার সাটিয়ে খলিল ওরফে বরিশাইল্লা খলিল মেম্বার কাবিলার স্থলাভিষিক্ত হয়। কাবিলার পুরো বাহিনী খলিলের হয়ে কাজ করে। কাবিলা অন্তরালে থাকলেও খলিল মেম্বার মদনপুরের পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি, মাদক পাঁচার ও বিক্রির সিন্ডিকেট, ডাকাতির একটি দলও গঠন করে। পুলিশের উপর হামলা চালিয়ে গত বছরের ১৮ নভেম্বর স্বর্ণের দোকানে লুটপাট করে প্রায় ২ কোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায় খলিল বাহিনী। গত বুধবার ড্রেজারের পাইপ স্থাপনকে কেন্দ্র করে জুয়েল নামে যুবককে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে মনুকেও হত্যা করা হয়েছে।

বন্দরের মদনপুরে গত দুই যুগে প্রায় ২২ টি খুন চিহ্নিত হলেও অনেক অজানা লাশ আছে ইস্ট টাউনের বালুর নীচে এমনই মন্তব্য স্থানীয় সচেতন মহলের।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক আজকের দেশকন্ঠ
পোর্টাল বাস্তবায়নে : আজকের দেশকন্ঠ আইটি