নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গত ২ দিনে শিশুসহ ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় চারটি অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় চারজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এবং একজনকে আদালতে পেরণ করা হয়েছে। এছাড়া গণপিটুনিতে আহত এক অভিযুক্ত পুলিশি পাহারায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, অভিযুক্তরা নানা প্রলোভন দেখিয়ে শিশুদেরকে ডেকে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন করেছে। গত ২২ মে ফতুল্লার বক্তাবলী এলাকায় ছয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে দুই যুবকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। প্রধান অভিযুক্ত বক্তাবলী এলাকার মনির হোসেনের ছেলে হিরো (২২) ও তার সহযোগী জামাল পাটোয়ারীর ছেলে সোহেল (২১)। স্থানীয়দের গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হন হিরো। শনিবার (২৩ মে) সকালে ভুক্তভোগী শিশুর মা ফতুল্লা মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অভিযোগ দায়ের করেন।
অন্যদিকে ফতুল্লার লামাপাড়ায় এক মাদরাসা শিক্ষিকাকে (১৮) ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মাওলানা বেলাল হোসেন ওসমানীকে (৪৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি একই এলাকার মৃত ওসমান গণির ছেলে এবং মারকাজ মসজিদসংলগ্ন জামিয়া ওসমানিয়া মহিলা মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক।
এঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষিকা বাদী হয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে ফতুল্লা মডেল থানা মামলা করেন।
এ মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে ওই তরুণী আবাসিক শিক্ষিকা হিসেবে মাদরাসাটিতে যোগ দেন। এরপর থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক তাকে বিভিন্ন সময় কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে শিক্ষিকার কক্ষে প্রবেশ করে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। এ সময় তিনি চিৎকার করলে অভিযুক্ত পালিয়ে যান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আসামিকে গ্রেপ্তারের পর শনিবার দুপুরে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানা ওসি মাহবুব আলম।
এদিকে রোববার দুপুরে ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা এলাকায় পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে আনোয়ার (৪৮) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। তিনি জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানার ধনতলা গ্রামের মৃত আব্দুল হাকিমের ছেলে।
পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত আনোয়ার ও শিশুটির পরিবার একই বাসায় পাশাপাশি কক্ষে ভাড়া থাকতেন। শিশুটির বাবা-মা গার্মেন্টসে কাজ করেন। শনিবার সকালে তারা কর্মস্থলে যাওয়ার পর আনোয়ার মোবাইলে চার্জ দেওয়ার কথা বলে শিশুটির কক্ষে প্রবেশ করেন। পরে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সকালে ভুক্তভোগী শিশুর মা ফতুল্লা থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। পরে শিশুটিকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।
একই দিন রোববার দুপুরে বক্তাবলী বাজার এলাকায় ছয় বছরের এক পথশিশুকে (ভিক্ষুক) ১৫০ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে মো. নাজির হোসেন (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে স্থানীয়রা। পরে গণপিটুনির পর তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
অভিযুক্ত নাজির বক্তাবলী প্রতাপনগর এলাকার জুলহাসের ছেলে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ভুক্তভোগী শিশুকেও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি রীনা আহমেদ বলেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। একজন নারী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে তিনি মনে করেন, এসব ঘটনার পেছনে মাদকাসক্তি বড় একটি কারণ। অধিকাংশ ঘটনার তদন্তে দেখা যাচ্ছে, অভিযুক্তরা মাদকাসক্ত। ফলে সমাজে এটি এখন এক ধরনের ভয়াবহ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
সংগঠনটি এসব ঘটনার প্রতিবাদ করছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের কাছেও দ্রুত বিচার ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে। গত ১৯ মে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে দেশের ৫৬ জেলায় একযোগে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এরপরও নতুন নতুন নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি আরও বলেন, শিশুদের ওপর এ ধরনের নির্মম নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা নিজেরাই অপরাধ স্বীকার করছে, তারপরও বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা দেখা যায়। তাই দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক ও প্রকাশ্য শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করতে সাহস না পায়।
রীনা আহমেদের দাবি, মাদকের বিস্তার সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক অনেক ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্তদের মাদকাসক্ত হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে। শুধু নারী বা শিশু নয়, মাদরাসাগুলোতেও বলাৎকারের মতো ঘটনা ঘটছে। প্রযুক্তির কারণে কিছু ঘটনা দ্রুত সামনে এলেও অসংখ্য ঘটনা এখনও আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, নারী আন্দোলনের কর্মীরা সব সময় নারী হত্যা, শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ ও পরিবারকে আরও সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।