কয়েক বছর আগে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের পতাকার আদলে রঙ করে দেশ ও দেশের বাইরে আলোচনায় আসা সেই ‘ব্রাজিল বাড়ি’তে এবার ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নেই কোনো প্রস্তুতি। এমনকি বাড়ির উপরে সাঁটানো হয়নি ব্রাজিলের কোনো পতাকাও।
যদিও এখনো বাড়িটির দেয়ালের রঙ এখনো দেশটির পতাকার রঙেই আছে। তবে, কয়েক স্থানে তার পলেস্তারা উঠে গেছে। ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বিগত বছরগুলোতে নানা প্রস্তুতি থাকলেও এবার তা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তার উপর বাড়ির মালিক জয়নাল আবেদীন টুটুল নিজেও আছেন আত্মগোপনে। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সময় ‘তেলচুরি’, অন্যদিকে ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ’ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে একাধিক মামলাও রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, বিশ্বকাপ এলেই এ বাড়িকে কেন্দ্র করে বিগত বছরগুলোতে বেশ উৎসাহ ও উন্মাদনা দেখেছেন তারা। ভবনের ছাদ ও চারপাশে ব্রাজিলের পতাকায় শোভিত করা থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের আগমনি মিছিল ও ব্রাজিলের খেলার সময় ‘জায়ান্ট স্ক্রিনে’ (বড় পর্দায়) প্রদর্শনীও দেখেছেন। এমনকি দূর-দূরান্ত থেকে লোকজনও আসতেন এ ভবনটি দেখতে। কিন্তু এবার তার কোনো আমেজ নেই। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ গড়ানোর আর এক সপ্তাহের মতো সময় বাকি থাকলেও বাড়িটি এবার একেবারেই নিরব।
এর পেছনে কয়েকটি কারণও জানালেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্যমতে, জ্বালানি তেল সরবরাহকারী রাষ্ট্রয়াত্ত প্রতিষ্ঠান ‘যমুন ওয়েল কোম্পানি’র কর্মচারী ছিলেন জয়নাল আবেদীন টুটুল। এ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেই তিনি বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হন। এ নিয়ে দেশের একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্তেও নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তখনই বেকায়দায় পড়ে ‘ব্রাজিল বাড়ি’র এ মালিক।
এরপর ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ওই সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকার অভিযোগে স্থানীয় প্রতিপক্ষের লোকজন তার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এরপর থেকে আত্মগোপনে চলে যান টুটুল। তার বাড়িতে এখন কয়েকজন ভাড়াটিয়া থাকলেও পরিবারের সদস্যরা থাকেন অন্য জায়গায়।
বিগত সময়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ব্রাজিল ফুটবল দলের ভক্ত জয়নাল আবেদীন টুটুল ২০১০ সালে প্রথমবার তার বাড়িটিকে ওই দেশটির পতাকার আদলে রঙ করেন। তখন বাড়িটি ছিল দোতলা। এরপর বাড়িটি তিনি ছয়তলায় উন্নীত। ২০১৮ সালে ২১তম বিশ্বকাপের আসরে সারাদেশে আলোচনায় আসে তার ‘ব্রাজিল বাড়ি’। ওই বছর ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতও এ বাড়িটি পরিদর্শনে আসেন। যা পরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরেও আসে।
তবে, বিশ্বকাপের ২৩তম আসরকে কেন্দ্র করে ‘ব্রাজিল বাড়ি’তে নেই কোনো আয়োজন। সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়িটির ভেতরের অংশে মেরামতের কাজ চলছে। দেয়ালের সবুজ ও হলুদ রঙও অনেকটা ফিকে হয়ে পড়েছে। অন্যবছর এ বাড়ি দেখতে লোকজন আসলেও এবার তেমন কোনো দৃশ্য চোখে পড়েনি। বরং বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিও জানালেন, বাড়িওয়ালা না থাকায় এবার নেই কোনো আয়োজন।
স্থানীয় মুদি দোকানি দেলোয়ার হোসেন বলেন, “২০২৪ সালের আন্দোলনের পর থেকেই এখানে মানুষ কম আসে। আগে বাড়ির মালিক থাকতেন। ফুটবল খেলার সময় বাড়ি নতুন করে রঙ করতেন। পতাকা লাগিয়ে রাখতেন এবং ব্রাজিলের পতাকা নিয়ে এলাকায় মিছিলও করতেন। তবে এবার এসব কিছু হচ্ছে না।”
“আমরা আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক হলেও এখানে আসতাম। তাদের বাড়ির ছাদে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে বিশ্বকাপ খেলা উপভোগ করেছি। তবে এবার সেরকম কোনো ব্যবস্থাই দেখছি না ব্রাজিল বাড়িতে,” বলছিলেন জুনায়েদ আহমেদ নামে স্থানীয় এক তরুণ।
আত্মগোপনে থাকায় বাড়ির মালিক জয়নাল আবেদীন টুটুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা রেজাউল হাওলাদার বলেন, “কিছুদিন টুটুল সাহেবের মা এখানে ছিলেন। তবে এখন আর কেউ আসেন না। আমিই দেখাশোনা করছি এবং বাড়িটি ভাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে কয়েকটি ফ্ল্যাট ভাড়া হয়েছে। বাড়ির মেরামতের কাজও শুরু হয়েছে।”